Tuesday, May 27, 2025

হাসপাতালের ওষুধ বিক্রি হয় ফার্মেসীতে

 


সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের অফিস প্রধান থেকে শুরু করে নিম্ন পদস্থ কর্মচারীরা নিয়মিত অফিস করেন না। হয় অনুপস্থিত থাকেন, না হয় বিলম্বে আসেন। বেসরকারি ফার্মেসীতে বিক্রয় হয় সরকারিভাবে ক্রয় করা ওষুধ। সোমবার দুপুরে এক অভিযানে এমন অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুদক। সিলেট দুদকের কর্মকর্তারা এই অভিযান পরিচালনা করেন। 

দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দুদকের অভিযান চলে হাসপাতালে। এসময় হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরের ওয়াশরুমের পরিচ্ছন্নতা ও খাবারের মান যাচাই—বাচাই করা হয়। বহি:বিভাগে ডাক্তারের সহকারীরা রোগীর ব্যবস্থাপত্র লেখা, ডিসপেনসারিতে রোগীদের দেওয়া ওষুধ পাওয়ার স্লিপে ডাক্তারের নাম পদবি ও সিল না থাকা, রেজিস্ট্রার খাতায় ও স্টোররুমে থাকা ওষুধের গরমিল দেখতে পান দুদক কর্মকর্তারা। তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে কয়েকঘণ্টা যাচাই—বাছাইকালে বিগত সময়ের সকল দরপত্রের কাগজপত্র চান তারা। কিন্তু উপস্থিত হাসপাতাল কর্মকর্তারা তত্ত্বাবধায়ক না থাকায় এসব কাগজপত্র দেখাতে পারেন নি। এছাড়াও গেল মে মাসের আগের ওষুধ কেনার ফাইলপত্র বা কাগজপত্র দেখাতে পারেন নি উপস্থিত দায়িত্বশীলরা। এসময় দুদক কর্মকর্তারা বলেন, সবকিছুই হাসপাতালের সাবেক স্টোর কিপার সোলেমান গায়েব করে ফেলছে। 

অভিযান শেষে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় সিলেটের সহকারী পরিচালক জুয়েল মজুমদার বলেন, হাসপাতালের অফিস প্রধান থেকে শুরু করে নিম্ন পদস্থ কর্মচারীরা নিয়মিত অফিস করেন না। হয় অনুপস্থিত থাকেন, না হয় বিলম্বে আসেন। অধিকাংশই অর্থাৎ অর্ধেকেই অনুপস্থিত থাকেন। আজকে এসে আমরা দুইজন অনুপস্থিত পাই। এরমধ্যে অফিস প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান এবং মেডিকেল টেকনিক্যাল অফিসার আনোয়ার হোসেনকে অনুপস্থিত পেয়েছি। আনোয়ার হোসেন অনুপস্থিত, কিন্তু কোনো ছুটির আবেদন নেই। এ বিষয়ে অফিস প্রধানের দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে যিনি আছেন, তিনি কিছুই জানেন না। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মৌখিকভাবে আনোয়ার হোসেনকে ছুটি দিয়েছেন। আনোয়ার হোসেন নিয়মিত অফিস করেন না, এই অভিযোগ আমাদের কাছে রয়েছে। 

এছাড়াও হাসপাতাল থেকে অধিকাংশ কর্মকর্তা—কর্মচারী যখন বের হয়ে যায়, তখন তারা বায়োমেট্রিক ব্যবহার করেন না। এতে করে তারা কয়টায় বের হয়ে গেলো, তার ডকুমেন্ট নেই।

তিনি আরও বলেন, বড় যে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেটা হচ্ছে, হাসপাতালের ডিসপেনসারিতে বেসরকারিভাবে দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা ওষুধের পরিমাণ রেজিস্ট্রার খাতায় এন্ট্রি করা নেই। কিন্তু গোডাউনে অনেক এন্টিবায়োটিক ওষুধের মধ্যে তিন ধরনের এন্টিবায়োটিক ওষুধ পেয়েছি। যেগুলো রেজিস্ট্রার খাতায় এন্টি্র নেই। এছাড়াও সুলেমান নামে একজন স্টোরকিপার ছিলেন, তিনি রেজিস্ট্রার মেইনটেইন করেন নি। বেসরকারি ওষুধের তালিকা তিনি রেজিস্ট্রার খাতায় এন্ট্রি করতেন, সেই খাতা আমরা পাইনি। অর্থাৎ গত মে মাসের আগের কোনো প্রমাণ আমরা পাই নি। ক্রয়কৃত ওষুধের রেজিস্ট্রার নেই। বছরে কমপক্ষে দুই থেকে তিন কোটি টাকার ওষুধ ক্রয় করা হয়। এরমধ্যে অধিকাংশ টাকাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। এইটার জন্য সাবেক স্টোরকিপার সুলেমানকে বর্তমান কর্মকর্তারা দায়ী করছেন। বর্তমানে যে ওষুধ বিতরণ কর্মকর্তা রয়েছে, তারও অনেক দায় আছে। স্টোরে অনেক এন্টিবায়োটিক ওষুধ পেয়েছি। এগুলো রেজিস্ট্রার খাতায় এন্ট্রি নেই। এগুলো ফার্মেসিতে বিক্রয় হয় বলেও মন্তব্য করেন তারা। 

দুদকের এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা অনিয়মের অনেক কাগজপত্র সংগ্রহ করেছি। এই কাগজপত্র এবং রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, রোগীদের বাথরুমগুলো অপরিষ্কার। এই বাথরুমগুলোতে রোগীদের যাওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু, ডাক্তারের যে ওয়াশরুম রয়েছে, সেগুলো আবার পরিস্কার আছে। 

ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ বলেন, আমাদের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান স্যার ব্যক্তিগত কারণে ছুটিতে থাকায় সাময়িকভাবে আমাকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। দুপুর বারোটার দিকে দুদক টিম হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। তারা তিনতলা থেকে চতুর্থ তলা, ষষ্ঠ তলা এবং ডিসপেনসারিতে যান। তারা খাদ্যের মান দেখেন, ডিসপেনসারিতে ওষুধপত্র দেখেন, রেজিস্ট্রার খাতাপত্র দেখেছেন। 

তিনি বলেন, তারা ওষুধের রেজিস্ট্রার খাতা, বিভিন্ন নথিপত্র নিয়ে গেছেন। এগুলো পর্যালোচনা করে দেখবেন। সেবার মান আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে অনিয়মের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান জানালেন তিনি ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় গেছেন। দুদকের কর্মকর্তারা হাসপাতালে গেছেন জেনেছেন তিনি। তিনি বলেন, আমি বিষয়টি ইতিবাচক দেখি। তাদের যাচাই—বাছাই বা পর্যালোচনায় কোন অভিযোগ পরিলক্ষিত হলে, আমরাও সেটি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ওষুধ কেনাসহ নানা বিষয়ে দুর্নীতি অনিয়ম হচ্ছে দাবি করে রোববার সিলেটের দুদকের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুনাজ্জির হোসেন সুজন।  


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: